ঋণ সংকটে থাকা মলদ্বীপের জন্য ভারত ও চিনের প্রভাব সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ: ভারত-চিন, দুই দেশকে কতটা সামলাতে পারবেন প্রেসিডেন্ট মুইজ্জুর?"
মলদ্বীপের নতুন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জুর প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ঋণ সংকট এবং এর সাথে জড়িত ভারত ও চিনের মতো শক্তিশালী দুই দেশের প্রভাব। মলদ্বীপ ঋণ সংকটে জর্জরিত, বিশেষ করে চিনের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের কারণে। একদিকে, চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীনে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য চিন থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছে, যার ফলে মলদ্বীপের ঋণের বোঝা বেড়ে গেছে। অন্যদিকে, ভারতও মলদ্বীপে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে চায় এবং তারা বিভিন্ন আর্থিক সহায়তা ও বিনিয়োগ দিয়ে মলদ্বীপের সাথে সম্পর্ক জোরদার করেছে।
মুইজ্জুর প্রশাসনের সামনে মূল প্রশ্ন হলো, কীভাবে তিনি এই দুই দেশের প্রভাবকে সামলাবেন এবং মলদ্বীপের ঋণ সমস্যা সমাধানের জন্য কৌশল গ্রহণ করবেন। ভারত-মলদ্বীপ সম্পর্ক সাধারণত ঘনিষ্ঠ হলেও, মুইজ্জুর চিন-পন্থী অবস্থান নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। এটা ভারত-মলদ্বীপ সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে। তবে মুইজ্জুর মলদ্বীপের ঋণ কাঠামো পুনর্গঠন ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কগুলিকে ভারসাম্যপূর্ণ করার জন্য কৌশলগত পন্থা নিতে হবে যাতে দেশের সার্বভৌমত্ব বজায় থাকে এবং ঋণ সংকটের সমাধান করা যায়।
সুতরাং, প্রেসিডেন্ট মুইজ্জুর কতটা সফল হবেন তা নির্ভর করবে কিভাবে তিনি চীনের ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং ভারতের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখেন।
২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত মলদ্বীপের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল $437 মিলিয়ন, যা এক মাসের বেশি আমদানি খরচের জন্য যথেষ্ট। ২০২৫ সালে দেশটি $600-$700 মিলিয়ন এবং ২০২৬ সালে $1 বিলিয়ন ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা করছে। মলদ্বীপ ইতিমধ্যে চিনের কাছ থেকে $1.3 বিলিয়ন এবং ভারতের কাছ থেকে $130 মিলিয়ন ঋণ নিয়েছে।
৭ অক্টোবর মলদ্বীপের প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে জরুরি আর্থিক সহায়তার জন্য দেখা করেন। রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারত $400 মিলিয়ন মুদ্রা বিনিময় চুক্তি অনুমোদন করেছে, যা ঋণে জর্জরিত মলদ্বীপের জন্য সহায়ক হবে। মলদ্বীপের ঋণ সমস্যাগুলি সুকুক বন্ডের সাথে সম্পর্কিত, যা ইসলামী বন্ডের একটি ধরন। সুকুকে বিনিয়োগকারীরা প্রকল্পের মালিকানা পান এবং তাদের লাভ সম্পদের উৎপন্ন আয়ের ওপর নির্ভর করে।
যদি মলদ্বীপ সুকুক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তাহলে এটি প্রথমবারের মতো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা হবে। ভারতের সমর্থন না পেলে, এই ব্যর্থতা মলদ্বীপের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে, যেমন আন্তর্জাতিক বাজারে অর্থ সংগ্রহে অসুবিধা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারানো। ভারত থেকে সাহায্যের আশ্বাস পাওয়ার পর মলদ্বীপ সুকুক ঋণ পরিশোধের সংকট এড়াতে পেরেছে, তবে দেশের বড় আর্থিক সমস্যা এখনো রয়ে গেছে, কারণ সামনে আরও ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
মলদ্বীপের অর্থনৈতিক সংকট ভারত ও চিনের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারে। বহু বছর ধরে, মলদ্বীপ এই দুই দেশের থেকে প্রচুর ঋণ নিয়েছে, আর দুই দেশই নিজেদের স্বার্থে মলদ্বীপকে সহায়তা করেছে।
চীনের ঋণগুলো মূলত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীনে অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে, যা ভারতীয় মহাসাগরে চীনের কৌশলগত উপস্থিতি বাড়াতে সহায়ক। অন্যদিকে, ভারত মলদ্বীপকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখে সাহায্য করেছে। ২০২৩ সালে ক্ষমতায় এসে প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু ‘ভারত আউট’ আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে ঋণ সংকট কাটাতে না পারায়, তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক করেছেন, কারণ মলদ্বীপের নিরাপত্তা ভারতের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
মলদ্বীপের প্রধান সমস্যা হলো ব্যাপক ঋণের বোঝা এবং দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামো। দেশটি পর্যটনের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল, যা বিভিন্ন সময়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যেমন কোভিড-১৯ মহামারির পর। অধিকাংশ প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করতে হয়, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে এর অর্থনৈতিক সংকট আরও বেড়ে যায়।
মুইজ্জুর নেতৃত্বে মলদ্বীপের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তিনি কীভাবে এই কঠিন কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে আর্থিক সহায়তা সংগ্রহ করবেন এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
মলদ্বীপের জন্য এখন এমন একটি নতুন কৌশল দরকার, যা পর্যটনের বাইরে অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করবে এবং আমদানির উপর নির্ভরতা কমাবে। তবে এসব পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। সরকার ট্যাক্স সংস্কার, বাজেট কমানো, এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠনের মতো সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু এসব বাস্তবায়ন করা কঠিন, কারণ ট্যাক্স বৃদ্ধি বা জনসেবা কাটছাঁটের মতো পদক্ষেপ প্রতিবাদ উস্কে দিতে পারে।
আইএমএফ থেকে বেইলআউটের সম্ভাবনাও আলোচনা হয়েছে, যদিও সরকার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে সংকট বাড়লে আইএমএফের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে, যা কঠিন শর্ত নিয়ে আসবে এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
মলদ্বীপের ঋণ সংকট বিদেশি ঋণ ও একক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য ছোট দেশগুলির জন্য সতর্কবার্তা। দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার কার্যকর হলে মলদ্বীপের অর্থনীতি পুনর্গঠিত হতে পারে।
মুইজ্জুর জন্য এই মুহূর্তে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে দেশের আর্থিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকে এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা হয়। মলদ্বীপের পরবর্তী পদক্ষেপগুলি অন্য ঋণগ্রস্ত ছোট দেশগুলির জন্য উদাহরণ হতে পারে।
ড.মোঃ মাখলুক হাছান


0 Comments